স্মৃতি চারণঃ খ্যাতনামা পূর্বসূরীদের উদ্দেশ্যে

৬ই আগষ্ট, ২০১২
সহকর্মীবৃন্দ, স্নেহের নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা
জন্মদিনের অনুষ্ঠানে সাধারণতঃ বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ থাকেনা । কিন্তু ভাবলাম সকলের উপস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু কথা বলি। রাজনীতি অঙ্গনে যেমন পূর্বসূরীদের স্মরণ করা হয় তেমনটি হয়না বিশ্ববিদ্যালয় ও অনুরূপ শিক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা অনুষদের কোন কোন বিভাগে যেমন বাংলা ও ইংরেজী বিভাগে
যে ভাবে খ্যাতমান শিক্ষকদের জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হয় তেমনটি হয়না জীববিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোতে। উদাহরণস্বরূপ উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের কথা বলা যায়। এই বিভাগে প্রোথিতযশা কয়েকজন বিজ্ঞানীদের নাম উল্লেখ করা যায় যেমন ড. পঞ্চানন মাহেশ্বরী, ড. মজিদ আহমেদ, ড. রেয়াত খান, ড. আশরাফুল হক, ড. নুরূল ইসলাম ও আখতারুজ্জামান। তাঁদের আমরা স্মরণ করি না। ড.পঞ্চানন মাহেশ্বরীর কথা ধরা যাক। আমার মনে হয়না যে সব শিক্ষার্থীরা ড. পঞ্চানন মাহেশ্বরীর লিখিত পাঠ্য পু¯তকের (An Introduction to the Embryology of Angiosperms) সাথে পরিচিত তারা ছাড়া কয় জনই বা তাঁর অতুলনীয় অবদানের কথা জানে। পাকভারতবাংলাদেশের জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনি একজন বিরল ব্যক্তি যাঁকে যুক্তরাজ্যের রয়াল সোসাইটি সদস্য পদে (ফেলো অব দ্য রয়াল সোসাইটি) ভূষিত করে।

দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং Indian National Science Academy-এর ফেলো ড. N.S. Rangaswami তাঁকে কর্মযোগী নামে আখ্যায়িত করেন। ড. মাহেশ্বরীর জন্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী পালন না করলে এই স্বনামধন্য উদ্ভিদবিদের অমূল্য অবদানের কথা ক্রমশই কালের অতল গর্ভে তলিয়ে যাবে । তাঁর অতুলনীয় অবদানের কথা বাংলাদেশে আর কেউ স্মরণ করবেনা।
একজন আদর্শ শিক্ষক হিসাবে ড. রেয়াত খান ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন; নিয়মানুবর্তীতার তিনি ছিলেন প্রতীক, পাছে দেরী না হয়ে যায় সে জন্য তাঁর বাসা থেকে তিনি বর্ষার সময় বিভাগের উদ্দেশ্যে সকাল সকাল রওয়ানা হতেন, দশ বছর চাকরী জীবনে পরীক্ষার খাতা জমা দিতে তাঁর একবারও দেরী হয়নি।
গবেষণার কাজে ড. আশরাফুল হক এত উৎকর্ষতা অর্জন করেন যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিখ্যাত প্রফেসার ড. সি ডি ডার্লিংটন এক বছর অন্তর অন্তর তাঁর ল্যাবে গবেষণার করার জন্য আশরাফ সাহেবকে আমন্ত্রণ জানাতেন; সেখানকার গবেষণা লব্ধ Heredity’ প্রভৃতি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

ড. মজিদ আহমেদের কথা বলতে একটি মজার ঘটনার কথা মনে পড়ে। আমি তখন কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত। কেন্ স্যান্ডারসান নামে বিভাগীয় একজন সহযোগী গবেষককে দেখলাম তিনি আমাকে আমার প্রাপ্যের চেয়ে বেশী সম্মান প্রদর্শন করছেন। কৌতুহলী হয়ে একদিন তাঁর কাছে এই প্রসঙ্গটা উত্থাপন করলাম। বিস্মিত হয়ে তিনি আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন। কেন, আপনি কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মজিদ আহমেদ নন যিনি বেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত বংশগতিবিদ ড. ক্যাচেসাইডের তত্ত্বাবধানে পি.এইচডি করেছিলেন? আমি হাসাতে তিনি অপ্রস্তুত হলেন এবং আমাকে হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। অত্যন্ত কষ্টে হাসি চেপে রেখে বললাম, ”আমি ঐ একই বিভাগে কাজ করি এবং আমার প্রথম নাম আর ড. মজিদ আহমেদের সারনেম একই।” কেন্ স্যান্ডারসান বর্তমানে ক্যানাডার নামকরা বিশ্ববিদ্যলয়ের অনুজীব বিভাগের একজন নামকরা অধ্যাপক। ড. মজিদ আহমেদ নিউরোস্পোরা নামক ছত্রাকের জীন সমষ্টির সূক্ষ্ম গঠনের উপরে কাজ করে দেশ ও বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেন। 
প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়েও ড. সালার খান অক্লান্ত ও একনিষ্ঠ পরিশ্রম দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় হারবেরিয়াম প্রতিষ্ঠিত করেন। এর কার্যক্রম শুরু প্রথমে গ্রিন রোডের একটি ভাড়াটে বাড়ীতে। এখন এটি বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের অভ্যন্তরে নিজস্ব ভবনে অবস্থিত। বাংলাদেশ জার্নাল অব প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনমি তাঁর একটি মূল্যবান অবদান। বিশ্বে এই ষান্মাষিক সাময়িকীটি একটি সম্মানজনক স্থান করে নিয়েছে।

ড. নুরুল ইসলামের অবদান শৈবাল জগতে অনন্য। তিনি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রফেসার এ.ড. Prescott-এর ছাত্র ছিলেন। তিনি একক ও যৌথভাবে ২০০-র কাছাকাছি প্রবন্ধ প্রকাশ করনে। তাঁর সম্পর্কে একটি কথা না বললেই নয়। তাঁর চাকরী জীবনের প্রথম দিকে ফজলুল হলের সংলগ্ন পশ্চিমদিকে যে পুকুরটি আছে সেখানে একটি কচ্ছপের পিঠে কয়েকটি সবুজ দাগ ড. নুরূল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই সবুজ দাগটির সম্পর্কে তিনি গবেষণা চালিয়ে গেলেন এবং  আবিষ্কার করলেন যে সবুজ দাগগুলো একটি নির্দিষ্ট শৈবাল, Basicladium-র উপস্থিতির জন্য। তাঁর অনন্য অবদানরে জন্য বাংলাদশে সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক পদে ভূষিত কর। ড. আখতারুজ্জামানরে কথা বলতে গিয়ে মাতৃভাষার্ প্রতি যে তাঁর কত গভীর অনুরাগ ছলি তা তাঁর রচিত বইগুলো নিরীক্ষণ করলেই বুঝা যায়। মাতৃভাষায় স্নাতক পর্যায়ে বংশগতবিদ্যা ও কোষবংশগতবিবিদ্যা (সাইটোজনেটেক্সি) বিবর্তন বিষয়ের পাঁচটি বই লিখেই তিনি ক্ষান্ত হন নাই ।
জীব জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মহাপন্ডিত বিজ্ঞানী ডারুইন এর দ্বারা রচিত Origin of Species অনুবাদ করে বাঙলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন। যারা অনুবাদ করেছেন  তাঁরাই কেবল উপলব্ধি করতে পারবেন বাংলায় ভাষান্তর করাটা কতটা দুরূহ ।

এই সব ক্ষণজন্মা মনীষীদের জন্ম/মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে স্মৃতিচারণ করলে একদিকে যেমন তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে, অন্যদিকে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিভাগের পূর্বসূরী খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের অমূল্য অবদানের কথা জেনে অনুপ্রাণিত হবে ও সেই দুর্গম পথে চলবার প্রচেষ্টা চালাবে। নবীন বরণ করার সময় পূর্বসূরী খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের স্মৃতিচারণ
করলে এই কাজটি সহজ হয়ে যাবে। উদ্ভিদ বার্তাতে তাঁদের জীবনী প্রকাশ করলে সহজে শিক্ষার্থীরা এদের সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে পারবে। আমি এই প্রসঙ্গে একটি কমিটি গঠন করার প্রস্তাব করি। অধ্যপক ইমদাদুল হক এবং অধ্যপক রাখহরি সরকারকে এই কমিটির ভার নিতে অনুরোধ করব। আজকাল ইন্টারনেটের যুগ। এর সুযোগ নিয়ে একটি সুন্দর ইন্টারএ্যাকটিভ্ ওয়েবসাইট খোলা যেতে পারে। এর জন্য অনুর্ধ ৪০ হাজার টাকার প্রয়োজন।  আপনাদের সম্মতি পেলে আমি সানন্দে এই অর্থের যোগান দিব। এই ওয়েবসাইটে থাকবে উপরোক্ত ছয়জন উদ্ভিদবিজ্ঞানীর সংক্ষিপ্ত জীবনীর রূপরেখা এবং তাঁদের জন্ম- ও মৃত্যু বার্ষিকীর তারিখসহ অন্যান্য দরকারী তথ্যাবলী। উইকিপেডিয়াতে যেমন সংকলিত তথ্যে বাড়তি উপাত্ত সংযোজন করা যায় প্রস্তাবিত ওয়েবসাইটেও সে সুবিধাটুকু থাকবে যাতে করে মডারেটরের অনুমোদন সাপেক্ষে পাঠক/পাঠিকারা বাড়তি তথ্য সংযোজন বা ভুল তথ্যাদি বাদ দিতে পারবেন। ওয়েবসাইটের নাম botanycelebratiesdu.org দেওয়া যেতে পারে ।
আপনাদের প্রত্যেককে অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।